যখন প্রেমের সময়টা সঠিক ছিল, তখন তোমার কাছে আমি সঠিক মানুষ ছিলাম না। যখন তুমি আমাকেই তোমার সঠিক মানুষ নির্বাচিত করলে, তখন সময়টা আর সঠিক ছিল না।

একটা বড় অংশ আছে, যাদের কাছে মুজিব-জিয়া বা ওবামা-ট্রাম্প কোনোটাই গুরুত্বপূর্ণ না। এরা গুরুত্বদেয়ার ভাব নিয়ে সব কিছু দেখে এবং শোনে।

অথচ আসলে এরা কেউ কেউ ৯টা ৫টা অফিস করে, কারো কারো প্রতি পদের পেছনে আছে কেবলই কারবার। এদেরই কেউ আবার ৌপ্রেমিকাকে রাত জেগে স্বপ্ন দেখায় নতুন পৃথিবীর, কেউ আবার স্বপ্ন পোড়ার জ্বালা নিয়ে সিগারেটের ধোঁয়ায় সমস্ত রাত্রি পুড়িয়ে খুব সকালে ঘুমোতে যায়। এদের মধ্যে অনেক নারী চরিত্রও আছে, এরা নেতা-নেত্রী কিংবা সরকারের ভাবনা একবারও ভাবে না। তবুও আশ্চর্যজনক ভাবে এদের রাতের তিনভাগের দুভাগই নির্ঘুম কাটে কেবলই ভাবনায়!

প্রিয়তম প্রেয়সী আমার,

তোমাকে কতটুকু ভালোবাসি এটা জানার কৌশল হিসেবেই তুমি আমার কাছে একখানি চিঠি চেয়ে বসলে কি-না আমি জানি না, তবে আমি এতটুকু জানি তুমি ঠিক হাতিয়ারটিই ব্যবহার করেছো। চিঠি এমন একটি উপায়, যেখানে ভেতরের কথাগুলো আর ভেতরের থাকে না, প্রতিটি অক্ষর প্রকাশ করে দেয় হৃদয়ের রূপকে। তোমায় লেখা এটিই বোধহয় আমার প্রথম পত্র, কেবল পত্র বলছি কেন? অবশ্যই প্রেমপত্র লিখছি।☺️

প্রিয়তম বধু আমার, আমি তোমাকে অতীতে কতটুকু ভালোবেসেছি আমি জানি না। তবে এতটুকু জানি, যতটুকু বেসেছি আমার সামর্থের অতি অল্পই তা! এর চেয়ে অনেক বেশিগুণ তীক্ষ্ণ ও তীব্র প্রেম লালন করি আমি।😉 আমার কোমল প্রেম পাচ্ছো তুমি গত বছর খানেক, জানিনা কতটুকু কোমল উষ্ণতা অনূভব করেছো বা করছো। আর তীব্র প্রেমগুলো অপেক্ষা করছে তোমার সামনের দিনগুলোকে রাঙাতে, হলি খেলতে জানোতো বউ? 😎

তুমিতো জানো, আমি আমার আপন স্বভাবে চলি। প্রশ্ন করতেই পারো- বিয়ের বয়স প্রায় পাঁচ পেরোয়, এখনো নাকি আসল প্রেমের সূত্রপাতই হয়নি! তাহলে এতদিন তুমি পেয়েছোটা কি? 🙄

🤔🤔🤔ঠকেছো হয়তো!🤔🤔🤔

আরে আরে এতো সিরিয়াস হওয়ার কিছু নাই!! এতদিনে আমার আদর্শগুলোতো বুঝেছো? সেই ভালো, এবার আমার আসল প্রেমের রূপটাকে বুঝবে, খারাপ কি? জানোইতো আমি সাধারনত্বকে ধারন করি না, হয় অসাধারন কিছু পাবে নয়তো অতি সাধারন কিছু, তবু সাধারনের মত নয়। নিকট ভবিষ্যতে কি পাবে এটা নিয়ে যদি এখনি তোমার মধ্যে টেনশন কাজ করা শুরু করে, তবে তোমাকে শিতল কিংবা আশাবাদী হওয়ার মত একটা জবাব দিচ্ছি- এতদিন তুমি কিছুই পাওনি! 😎😎😎

প্রিয় অর্ধাঙ্গী আমার, তুমি দিনে দিনে আরো পরিপক্ক বধু হয়ে উঠছো। সংসার করছো, এমন গোঁয়ার স্বামী এবং ডায়নামিক সংসার সামলাচ্ছো। তুমি আসলেই পরিনিতা হয়ে গেছো? তুমি কি শরৎ বাবুর গল্পের পরিনিতা না তার চেয়েও ডের জীবন্ত আমার অর্ধাঙ্গী পরিনিতা? 😊

তুমি নিশ্চয় জানো, আমি ঠোঁট কাঁটা মানুষ। এই পৃথিবীতে আমি সবচেয়ে বেশি কাকে বিশ্বাস করি জানো? আমার নিজেকে! আর আমিই তোমাকে বলছি- আমি তোমাকে অত্যন্ত বেশি ভালোবাসি, অনেক অনেক বেশি। যা আগের তোমার চেয়ে কয়েক কোটি গুণ বেশি!

অতি প্রকাশ প্রেমের মূল্যবোধ নষ্টকরে, এর চেয়ে বেশি প্রকাশ করা যৌক্তিক মনে করছি না। আশির্বাদ করি আমৃত্যু আমার বামবুক শুধুমাত্র এবং কেবলমাত্র তোমার জন্যই যেন থাকে, পৃথিবীর সমস্ত সুগন্ধি ফুলের সমাবেশ যে বাগানে হয় সে বাগানেই সৃষ্টিকর্তা যেন তোমার আমার শেষ জীবন দান করেন। তুমি অনিন্দ্য সুন্দরী হয়ে উঠো আমার জীবনের প্রতিটি সকালে।

ইতি— তোমার একমাত্র প্রেমিক পুরুষ।

তোমার বামবুকের তিলের কসম!

আমার শার্টের ফাঁকের বুকের ভেতরে

এখনো তোমার হাতই হেঁটে বেড়ায়।

বাম বুকে কান পেতে শোনো-

এখনো দ্রুত স্পন্দনগুলো বলে যাবে,

আমার ভালোবাসা আজো কতটা অস্থির।

দৃকের রেস্তরায় আর কখনো বসিনি আমি,

কেউ আমাকে গুণগুণ গানে আর বলেনি

কি জাদু করিলা—

এখনো দিন শেষে সন্ধ্যা নামে,

সব পাখি ঘরে ফেরে, তবু সব লেনদেন ফুরোয় না।

রাত্রি গভীর হলেও রাত্রির দেখা মেলে না!

এক অনন্য সাধারণ বাংলাদেশি! বাংলার ইতিহাসে আর কখনো এমন মানুষের জন্ম হবে কি না সন্দেহ!

তাঁর নাম ছয়ফুর রহমান। পেশায় ছিলেন বাবুর্চি। খুব নামিদামি বাবুর্চি এমন নয়। সিলেটের সালুটিকর নামের একেবারেই গ্রাম্য বাজারের পাশের ছাপড়া ঘরের দিন আনি দিন খাই বাবুর্চি। তাঁর দ্বিতীয় পেশা ছিল ঠেলাগাড়ি চালনা। যখন বাবুর্চিগিরি করে আয় রোজগার হতো না তখন ঠেলাগাড়ি চালাতেন। কিন্তু এই লোকটির ছিল অসম সাহস। যেকোনো ইস্যুতে তিনি একেবারেই জনসম্পৃক্ত রাজনীতি করতেন। ধরুন সালুটিকর থেকে শহরে আসার বাসভাড়া আটআনা বেড়ে গেছে। ছয়ফুর রহমান কোর্ট পয়েন্টে একটা মাইক বেঁধে নিয়ে ওইদিন বিকালে প্রতিবাদ সভা করবেনই করবেন।

বক্তা হিসেবে অসম্ভব রসিক লোক ছিলেন। ছড়ার সুরে সুরে বক্তৃতা করবেন। তারপর মূল ইস্যু নিয়ে অনেক রসিকতা করবেন; কিন্তু দাবি তাঁর ঠিকই থাকবে।

তার বক্তৃতা শুনতে সাধারণ শ্রমজীবি মানুষের ভিড় হতো। তো বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরেই তিনি একটুকরো কাপড় বের করে সামনে রাখতেন। তারপর সবাইকে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় বলতেন, ‘আমি এই যে আপনাদের জন্য আন্দোলন করতেছি, আমার মাইকের খরচ দিবে কে? মাইকের খরচ দেন।’

অদ্ভুত ব্যাপার হল, কোনোদিনই মাইকের খরচ উঠতে দেরি হয়েছে এমনটা হয়নি। দুই টাকা, এক টাকা করে তার সামনের কাপড়টি ভরে উঠত। তারপর যখন তিনশ’ টাকা হয়ে গেল তখন মাইকের খরচ উঠে গেছে; তিনি তার কাপড়টি বন্ধ করে দিতেন।

অনেক সময় তার লেখা বই বিক্রি করেও জনসভার খরচ তুলতেন। অদ্ভুত কয়েকটি চটি সাইজের বই ছিল তার। একটির নাম ‘বাবুর্চি প্রেসিডেন্ট হতে চায়’। সেই বইটির পেছনে তার দাত-মুখ খিচানো একটা সাদাকালো ছবি, নিচে লেখা ‘দুর্নীতিবাজদেরকে দেখলেই এরকম ভ্যাংচি দিতে হবে’।

ছয়ফুর রহমান প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেন আশির দশকের শুরুতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে। তখন দেশে সরাসরি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতেন। তো সব প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর নিরাপত্তার জন্যই সঙ্গে পুলিশ দেওয়া হলো। ছয়ফুর তাঁর নিরাপত্তার জন্য দেিয়া পুলিশ প্রত্যাখ্যান করে বললেন, ‘এদেরকে খাওয়ানোর সাধ্য আমার নাই’। তবু সরকারি চাপাচাপিতে তাকে নূন্যতম দুইজন পুলিশ সঙ্গে নিতে হলো।

সে সময় দেখা যেত রিক্সায় দুইপাশে দুই কনেস্টবল আর ছয়ফুর রহমান রিক্সার মাঝখানে উঁচু হয়ে বসে কোথাও যাচ্ছেন।

নির্বাচনে খারাপ করেননি। সেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি ৬০-৬৫ জন প্রার্থীর মাঝে ৮ নম্বর হয়েছিলেন। তারপর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি দেশের ৮ নম্বর প্রেসিডেন্ট। ইলেকশনের দিন বাকি ৭ জন মরে গেলে আমি প্রেসিডেন্ট হতে পারতাম।’

অদ্ভুত এবং মজাদার সব নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল তাঁর। যেমন, দেশের কোনো রাস্তাঘাট পাকা করার দরকার নেই! রাস্তা তুলে দিয়ে সেখানে খাল করে ফেলতে হবে! নদীমাতৃক দেশে সেই খাল দিয়ে নৌকায় লোকজন চলাচল করবে! খালের পানিতে সেচ হবে-সব সমস্যার সহজ সমাধান।

তাঁর দলের নাম ছিল ‘ইসলামি সমাজতান্ত্রিক দল’। সেই দলে কোনো সদস্য নেওয়া হতো না। এমনকি উনার স্ত্রীকেও সদস্য করেননি। তিনি বলতেন, ‘একের বেশি লোক হলেই দল দুইভাগ হয়ে যাবে’।

ছক্কা ছয়ফুর বেশ কয়েকবার নির্বাচন করেছেন। কখনোই তাঁকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি; সবাই মজার ক্যান্ডিডেট হিসেবেই নিয়েছিল। কিন্তু তিনি ১৯৯০ সালের উপজেলা নির্বাচনে সিলেট সদর উপজেলায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। সে এক কাণ্ড ছিল বটে।

যথারীতি ছয়ফুর রহমান প্রার্থী হয়েছেন। তাঁর প্রতীক-ডাব। তিনি একটা হ্যান্ডমাইক বগলে নিয়ে একা একা প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। পোস্টার লিফলেট কিছুই নেই। কিন্তু বক্তৃতা তীর্যক। বাকি প্রার্থীদেরকে তুলাধুনা করে ফেলছেন। এরকম এক সন্ধ্যায় সিলেটের টিলাগড়ে তার উপর অন্য এক প্রার্থীর কয়েকজন পান্ডা হামলা করে বসল।

পরের দিন সেই খবর গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়ল। সাধারণ মানুষ বিরক্ত হলো। আহা! একেবারেই সাধারণ একটা মানুষ, তাঁর সঙ্গে গুন্ডামি করার কী দরকার ছিল?

ওইদিন বিকালে স্কুল ছুটির পর প্রথম মিছিল বের হলো সিলেট পাইলট স্কুলের ছাত্রদের উদ্যোগে। মিছিল লালদিঘীর রাস্তা হয়ে বন্দরবাজারে রাজাস্কুলের সামনে আসার পর রাজাস্কুলের ছেলেরাও যোগ দিল। ব্যস, বাকিটুকু ইতিহাস। মুহূর্তেই যেন সারা শহরে খবর হয়ে গেল। সন্ধ্যার মধ্যেই পাড়া-মহল্লা থেকে মিছিল শুরু হলো ছয়ফুরের ডাব মার্কার সমর্থনে। একেবারেই সাধারণ নির্দলীয় মানুষের মিছিল। পাড়া মহল্লার দোকানগুলোর সামনে আস্ত আস্ত ডাব ঝুলতে থাকল। রিক্সাওয়ালারা ট্রাফিক জ্যামে আটকেই জোরে জোরে ‘ডাব, ডাব’ বলে চিৎকার শুরু করে! সেই স্লোগান ম্যাক্সিকান ওয়েভসের মতো প্রতিধ্বনি হয়ে এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায় চলে যায়। অনেক প্রেসমালিক নিজেদের সাধ্যমতো হাজার দুইহাজার পোস্টার ছাপিয়ে নিজেদের এলাকায় সাঁটাতে থাকলেন। পাড়া-মহল্লার ক্লাব-সমিতিগুলো নিজেদের উদ্যোগে অফিস বসিয়ে ক্যাম্পেইন করতে থাকল।

অবস্থা এমন হলো যে, ছয়ফুর রহমানকে নির্বাচনী সভায় আনার এপয়েন্টমেন্ট পাওয়াই মুশকিল হয়ে গেল।

ছয়ফুর রহমান ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তাঁদের অফিস ছেড়ে দিল ছয়ফুরের নির্বাচনী প্রচার অফিস হিসেবে। পাড়ায় পাড়ায় ছেলেরা তাঁর নির্বাচনী জনসভার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সেখানে আনতে হলেও আগে মূল অফিসে গিয়ে ৫০০ টাকা এডভান্স করে আসতে হয়, নইলে ছয়ফুর রহমান আসেন না! কারণ, তাঁর বাবুর্চিগিরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফুলটাইম নির্বাচন করতে হলে সংসার খরচ দরকার।

আমার মনে হয় তিনিই একমাত্র প্রার্থী, যাকে তাঁরই নির্বাচনী জনসভায় নিয়ে আসার জন্য উল্টো টাকা দিতে হচ্ছে।

নির্বাচনের দিন জনগণ এক মহ-বিস্ময় প্রত্যক্ষ করল। আওয়ামীলীগের প্রার্থী ইফতেখার হোসেন শামীম জামানত রক্ষা করেছিলেন। আর মেজর জিয়ার দল সহ বাকি সবারই জামানত বাজেয়াপ্ত হলো। ডাব প্রতীকে ছয়ফুর পেয়েছিলেন ৫২ হাজার ভোট আর চাক্কা প্রতীকে আওয়ামীলীগের প্রার্থী ইফতেখার হোসেন শামীম পেয়েছিলেন ৩০ হাজার ভোট।

দক্ষিণ সুরমার এক কেন্দ্রে ছয়ফুর রহমানের ডাব পেয়েছিল ১৮০০+ ভোট! ওই কেন্দ্রে দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রজাপতি মার্কা পেয়েছে কুল্লে ১ ভোট।

আরও অবাক করা একটি ব্যাপার ঘটে নির্বাচনের দিন। প্রায় ভোটকেন্দ্রে জনগণ ডাব

মার্কার ব্যালেটের সাথে টাকাও ব্যালেটবাক্সে ঢুকিয়ে দেয়।

নির্বাচনের পরে ছয়ফুর রহমানের নাম পড়ে গেল ছক্কা ছয়ফুর। তিনি হাসিমুখে সেই উপাধি মেনে নিয়ে বললেন, ‘নির্বাচনে ছক্কা পিটানোয় মানুষ এই নাম দিয়েছে’।

উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে ছক্কা ছয়ফুর সফল ছিলেন। তাঁর মূল ফোকাস ছিল প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষা ঠিক করা। হুটহাট যেকোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাইমারি স্কুলে ঢুকে পড়তেন। শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলেই শোকজ করে দিতেন। সেই সময় প্রাইমারি স্কুলগুলো উপজেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে ছিল অনেকটাই।

তবে ছয়ফুর রহমানকে চ্যালেঞ্জ নিতে হয় বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের কারণে। ইউনিয়ন পরিষদের দুর্নীতি বন্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন। এতে ক্ষিপ্ত চেয়ারম্যানরা একজোট হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব দিলে যতদূর মনে পড়ে তাঁর উপজেলা চেয়ারম্যানশিপ স্থগিত করে মন্ত্রণালয়। পরে ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে উপজেলা পরিষদ বাতিল করে দিলে ছক্কা ছয়ফুরের স্বল্পমেয়াদী জনপ্রতিনিধিত্বের চিরতরে ইতি ঘটে।

এক নির্বাচনে খরচের জন্য তিনি কিছু টাকা সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচন কোনো কারণে হয়নি। কিন্তু ছয়ফুর জনগণের টাকা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে সেই ঐতিহাসিক কোর্টপয়েন্টে আবার আসলেন। এসে বলেলেন, ‘আপনারা তো আমাকে নির্বাচনে খরচ চালানোর জন্য কিছু টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু যেহেতু নির্বাচন হচ্ছে না; তাই আমি আপনাদের টাকাগুলো ফেরত দিতে চাই।’ লোকজন অনেক খুশি হয়ে বলল, ‘আমরা টাকা ফেরত নিতে চাই না; এগুলো আপনি নিয়ে নিন’।

তিনি যখন উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হলেন তখন রেজিষ্টারি মাঠে তার প্রথম জনসভা ছিল। হাজার হাজার মানুষের ঢল। তিল ধারণের ঠাঁই নেই। তিনি তার বক্তব্যে প্রথমেই সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন,

‘আমার নির্বাচনের শুরুতে আমার দুইটা ঠেলাগাড়ি ছিল। সংসার চলে না তাই একটি বেছি লাইছি। আর আমার বাড়িতে আপনারার বসাবার জায়গা ও নাই। পয়লা যখন রিলিফের চালান পাইমু সেখান থেকে কিছু বেছিয়া আপনারার বসাবার জায়গা করবো যদি আপনারা অনুমতি দেন।’

তখন হাজার হাজার জনগণ একসাথে হেসে উঠে বলল, ‘অনুমতি দিলাম’।

তিনি ছোট ছোট কয়েকটি বইও রচনা করেন। ‘বার্বুচি প্রেসিডেন্ট হতে চায়’, ‘পড়, বুঝাে, বল’ তার আলোচিত বই।

জীবনের শেষ সময়ে এই মহান মানুষটি সিলেট ডিসি অফিসের বারান্দায় চিকিৎসা খরচের দাবীতে অনশন করেছিলেন এবং দাবী আদায়ও করেছিলেন। চিরকালীন দারিদ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করেই এই মানুষটি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। সরলপ্রাণ এই সমাজবিপ্লবীর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

আরও প্রেম দিও আমাকে, এত অল্প প্রেমে আমার হয় না, আমি পারি না।

আরও প্রেম দিও, বেশি বেশি প্রেম দিও

যেন আমি রেখে কুলিয়ে উঠতে না পারি,

যেন চোখ ভরে,

হৃদয়ের সবকটি ঘর যেন ভরে যায়

যেন শরীর ভরে, এই তৃষ্ণার্ত শরীর।

প্রেম দিতে দিতে আমাকে অন্ধ করে দাও,

বধির করে দাও, আমি যেন শুধু তোমাকেই দেখি,

কোনও ঘৃণা, কোনও রক্তপাত যেন আমাকে দেখতে না হয়,

আমি যেন আকাশপার থেকে ভেসে আসা তোমার শুভ্র শব্দগুলো শুনি,

কোনও বোমারু বিমানের কর্কশতা, কারও আর্তনাদ, চিৎকার আমার কানে যেন না

পৌঁছোয়।

দীর্ঘকাল অসুখ আর মৃত্যুর কথা শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত

দীর্ঘকাল প্রেমহীনতার সঙ্গে পথ চলে আমি ক্লান্ত,

আমাকে শুশ্রুষা দাও, স্নান করিয়ে দাও তোমার শুদ্ধতম জলে।

যদি ভালো না বাসো, তবে বোলো না কিন্তু যে ভালোবাসো না,

মিথ্যে করে হলেও বোলো যে ভালোবাসো,

মিথ্যে করে হলেও প্রেম দিও,

আমি তো সত্যি সত্যি জানবো যে প্রেম দিচ্ছ,

আমি তো কাঁটাকে গোলাপ ভেবে হাতে নেব,

আমি তো টেরই পাবো না আমার আঙুল কেটে গেলে কাঁটায়,

রক্ত শুষে নেবে আঙুল থেকে, এদিকে ভাববো বুঝি চুমৃ খাচ্ছে!।

প্রেম দিও, যত প্রেম সারাজীবনে সঞ্চয় করেছো তার সবটুকু,

কোথাও কিছু লুকিয়ে রেখো না।

আমার তো অল্পতে হয় না, আমার তো যেন তেন প্রেমে মন বসে না,

উতল সমুদ্রের মত চাই, কোনওদিন না ফুরোনো প্রেম চাই,

কলঙ্কী কিশোরীর মত চাই,

কাণ্ডজ্ঞানহীনের মত চাই।

পাগল বলবে তো আমাকে? বলো।

লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চিকে একজন জিজ্ঞেস করেছিল- ‘মোনালিসা’ নামের ছবিটা শেষ করতে কতোদিন লেগেছে? ভিঞ্চি তাকে বলেছিলেন- ছবিটা আসলে শেষ হয়নি! পৃথিবীতে কোনো কিছুই শেষ হয়না! একটা ছবি আমরা যেখানে আঁকা থামিয়ে দেবো সেখানেই শেষ, একটা ছোটগল্প যেখানে লেখা শেষ করবো- সেখানেই শেষ! মোনালিসার যে হাসির রহস্য সেটারই কি শেষ আছে? নাকি জীবনানন্দ কি কারণে ট্রামের নীচে চাপা পড়লেন তারই আদৌ কূলকিনারা হয়েছে?

কেন অর্নবেরা সাহানারা গান গাইলে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে গান শুনতে, কেন রুদ্ররা সিফিলিসে আক্রান্ত হলে প্রাক্তন স্ত্রী তসলিমারা ছুটে যায় হাসপাতালে। বাস্তব জীবনের বেলা বোসেরা ফোন ধরেনা। বাস্তব জীবনের হিমুদের জন্য কোনো রূপা অপেক্ষা করেনা। কেন বাস্তব জীবনের সিনেমা গুলোর কোনো হ্যাপি এন্ডিং হয়না?

হ্যাঁ, পৃথিবীতে ‘কেউ না’ নামেরও একটা সম্পর্ক থাকে।

ও মারা গেছে শুনে আমার চোখ দিয়ে একফোঁটা জল বের হয়নি। ওকে জানানো হলোনা- বাস্তব জীবনের নায়িকারা কাঁদতে জানেনা। আমার মতো কেবল প্রিয় মানুষটার মৃত্যুর খবর জেনে কিছুক্ষণ ফুটপাথে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে পারে। তারপর বাড়িতে ফিরে চা খেতে খেতে খুব স্বাভাবিক গলায় বলতে পারে- মা জানো, ও না মারা গেছে!

‘ও’টা কে?

-কেউনা!

রবিঠাকুর বলেছিলেন- রাতের সমস্ত তারারা থাকে দিনের আলোর গভীরে। ‘কেউ না’ নামের সম্পর্কগুলোও সেরকম। দিনের আলোর তীব্রতায় রাতের মিটমিটে তারাগুলি দেখা যায়না। কেবল দেখা যায় গভীর রাতে। সমস্ত পৃথিবীর ঘুমের মধ্যেও মনের ভেতরের ঘুম ভাঙিয়ে জেগে ওঠে সেই ‘কেউ না’রা!

পৃথিবী নিজেও জানেনা- সে চলছে এইসব কেউ না হয়ে ওঠা ‘কেউ’দের নিয়ে!

হয়তো যে ছেলেটিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম- সেইই মৃতদেহের একপাশে এসে ফুল রাখবে, যে ভুল বুঝে দূরে সরে গিয়েছিল সেও দূর থেকে মৃত্যুর খবরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলবে, যে প্রেমিকটি প্রতারণা করেছিল- তারও চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে উঠবে!

কেবল আমরা জানবো- আমরা মরে গিয়েছিলাম কারোর ‘কেউ না’ হতে পারার অপরাধে!

কেবল পৃথিবী জানবে কেউ কেউ বেঁচেছিল কাউকে আপন করে নেওয়ার না বলা ভাষাহীন সাধে!

%d bloggers like this: